সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন মহারাজ

একটি ছেলে, গ্রামের ছেলে। দরিদ্র, কিন্তু sensitive। বাপ পুরুত, মারা গেলো। ছেলেটি শহরে এলো। সে পুরুতগিরি করবে না, পড়বে। Ambitious, পড়বে। শিক্ষার ভেতর দিয়ে, struggle এর ভিতর দিয়ে, আমি দেখতে পাচ্ছি, তার কুসংস্কার, গোঁড়ামি সমস্ত কেটে যাচ্ছে। বুদ্ধি  দিয়ে ছাড়া সে কোনো কিছু মানতে চাইছে না। কিন্তু তার কল্পনাশক্তি আছে, তার অনুভুতি আছে। ছোটখাটো জিনিস তাকে মুগ্ধ করছে। তাকে আনন্দ দিচ্ছে। হয়তো তার ভেতরে মহৎ একটা কিছু করার ক্ষমতা আছে, সম্ভাবনা আছে। কিন্তু করছে না।

কিন্তু সেটি শেষ কথা নয়। সেটি tragedyও নয়। সে মহৎ কিছু করছে না, তার দারিদ্র যাচ্ছে না। তার অভাব মিটছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবনবিমুখ হচ্ছে না। সে পালাচ্ছে না। Escape করছে না। সে বাঁচতে চাইছে। সে বলছে, বাঁচার মধ্যেই সার্থকতা, তার মধ্যেই আনন্দ। He wants to live.

জীবনবোধের এমন পাঠ কে কবে দিয়েছিল বাঙালিকে বড় পর্দায়? বেঁচে থাকাই এই পৃথিবীতে যে সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালির সামনে বড় পর্দায় এই কথা প্রথম বলেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। হোক সে প্রদোষ চন্দ্র মিত্র অথবা উদয়ন পণ্ডিত, অথবা হোক না সে কালজয়ী অপূর্ব কুমার রায় (ওরফে অপু); যত বহুমুখী সৃষ্টিই হোক না কেন, তারা তো আটকে ছিল বইয়ের নিশ্চল অক্ষরের মাঝে! বন্দি ছিল পাঠাগারের চার দেয়ালের মাঝে! কার গুণেই তারা বের হয়ে আসলো? বাঁধা পড়লো সেলুলয়েডের পর্দায়! সে যে চিরতরুণ, চির প্রাণোচ্ছল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 

মোহিতকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং আশালতা চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে মির্জাপুর স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জন্মের কিছুদিন পরেই তাঁরা সপরিবারে কৃষ্ণনগরে স্থানান্তরিত হন। বিখ্যাত নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন এই কৃষ্ণনগরেরই বাসিন্দা। সেই সূত্রে এই এলাকায় নাট্যচর্চার বেশ বড় একটা আবহ বিরাজ করতো প্রায় সবসময়ই।

প্রখ্যাত নাট্যনির্মাতা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।
চিত্র: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়; চিত্রসূত্র – ডেইলি অবজারভার

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসার আশেপাশেই বেশ কিছু নাট্যচর্চার থিয়েটার ছিল। তাঁরা সারা বছরই নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। তাঁর পিতামহ এমনই এক স্থানীয় নাট্যচর্চার থিয়েটারের সাথে যুক্ত ছিলেন সভাপতি হিসেবে। তাঁর সরকারি চাকুরিরত বাবাও নিজের চাকরির পাশাপাশি শখের বশে ঐ একই থিয়েটারে মাঝে মাঝে অভিনয় করতেন। 

আশেপাশের এরূপ পরিবেশ এবং পরিবারের মাঝে সাংস্কৃতিক আবহ বজায় থাকার কারণে এটি অনুমিতই যে, ধীরে ধীরে সৌমিত্র নিজেও এই নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত হয়ে যাবেন। স্কুলে থাকাকালীন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি অভিনয় করতেন এবং সাথে সাথে তিনি নিজেও বেশ কিছু থিয়েটারের সাথে যুক্ত হয়ে যান। স্কুল ত্যাগ করার পূর্বেই নাট্যচর্চা তাঁর জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

নাট্যচর্চার পাশাপাশি তিনি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিছুদিন পরে তাঁরা সপরিবারে কৃষ্ণনগর ছেড়ে চলে আসেন হাওড়াতে। সেখানে তিনি ভর্তি হন হাওড়া জেলা স্কুলে। এখান থেকে মাধ্যমিক সমাপ্ত করে তিনি ভর্তি হন কলকাতা সিটি কলেজে। কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি তাঁর নাট্যচর্চাও জোর কদমে চলতে থাকে।

কলেজে থাকাকালীন তাঁর সামনে এক অসামান্য সুযোগ আসে। বাংলা থিয়েটার তৎকালীন বাঙালি সমাজে নাট্যচর্চার মূলকেন্দ্র ছিল। অহীন্দ্র চৌধুরী ছিলেন বাংলা থিয়েটারের একজন প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সরাসরি তাঁর অধীনেই কাজ শুরু করার সুযোগ পান। তাঁর অধীনে থেকে তিনি নাটক বিষয়ে অনেক কিছু জানার সুযোগ পান। 

অহীন্দ্র চৌধুরী নানাভাবে সৌমিত্রকে সহায়তা করেছেন।
চিত্র: অহীন্দ্র চৌধুরী; চিত্রসূত্র – আনন্দবাজার

বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান নিয়ে তিনি হাওড়া কলেজ থেকে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকে স্নাতকোত্তর সমাপ্ত করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে। এই সময়ই তিনি শিশির ভাদুড়ির সংস্পর্শে আসেন। তাঁর অধীনে তিনি কাজ করতে শুরু করেন। শিশির ভাদুড়ির বেশ কিছু নাটকে তিনি অভিনয় করেন। শিশির ভাদুড়ির সাথে কাজের অনবদ্য অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি আজীবন এই শিল্পের সাথে থাকার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেন। এরই পাশাপাশি তিনি স্নাতকোত্তরও সমাপ্ত করে ফেলেন।

শিশির ভাদুড়ি ছিলেন সৌমিত্রের একজন গুরু।
চিত্র: শিশির ভাদুড়ি; চিত্রসূত্র – আনন্দবাজার

শিশির ভাদুড়ির সাথে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দেখা হয় শিশির ভাদুড়ির জীবনের একদম শেষের দিকে। ততদিনে তিনি থিয়েটার জীবন থেকে নিজেকে প্রায় গুটিয়ে ফেলেছিলেন বলা চলে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সৌমিত্রের কর্মস্পৃহা শিশির ভাদুড়িকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বেশ কিছু নাটকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। ১৯৫৯ সালের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সৌমিত্রের জীবনে একজন গুরু এবং পথনির্দেশক হিসেবে ছিলেন। 

নাট্যচর্চার পাশাপাশি তিনি রোজগারের চেষ্টাও শুরু করেন। উদার, গম্ভীর এবং ভরাট আওয়াজের কারণে তিনি সহজেই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে উপস্থাপকের চাকরি পেয়ে যান। এই চাকরি করার পাশাপাশি তিনি নাটক এবং চলচ্চিত্রে কাজের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।  

এদিকে চুপিসারে অন্য ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। ১৯৫৫ সালের দিকের ঘটনা। কলেজ পড়ুয়া ২০ বছরের সদ্য তরুণ সৌমিত্র গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায়শই বন্ধু বান্ধবদের সাথে নিয়ে চলে যান নাট্যমঞ্চে অথবা কোনো চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে। সেই সূত্রে তাঁর একদিন সাক্ষাৎ হয় সত্যজিৎ রায়ের সাথে। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো মুখ খুঁজছিলেন। সৌমিত্রকে দেখে সত্যজিৎ রায়ের মনে ধরলো। কিন্তু ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে কিশোর অপূর্বের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সৌমিত্রের বয়স ছিল বেশি। তাই ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে তাঁকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা সত্যজিৎ রায়ের মাথায় ছিল।

সত্যজিৎ রায় বাংলার ইতিহাসে সেরা একজন নির্মাতা।
চিত্র: সত্যজিৎ রায়; চিত্রসূত্র – Sense of Cinema

১৯৫৮ সালে একদিন তিনি গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাগর’ চলচ্চিত্রের শুটিং সেটে। বের হবেন, এমন সময় তাঁকে ধরে সত্যজিৎ রায় নিয়ে গেলেন অভিনেত্রী ছবি বিশ্বাসের কাছে। বললেন,

এ হলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’ এ অপুর ভূমিকায় অভিনয় করবে সৌমিত্র।’

এক মুহূর্ত আগেও তিনি জানতেন না এই খবর। হঠাৎ করেই পরিচালকের মুখে এই কথা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। নাটকে নিয়মিত অভিনয় করলেও কখনো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ হয়নি তাঁর। তাও একেবারে বড় পর্দায়! সৌমিত্র ভাবছিলেন, কেনই বা তাঁকে এত বড় চরিত্রে বাছাই করা হলো। কারণ, তিনি জানতেন, আর যাই হোক না কেন, তাঁর চেহারা ঠিক সেই অর্থে নায়কোচিত না। 

কিন্তু বিধাতা হয়তো ভাগ্যে রেখছিলেন অন্য কিছু। তাই তিনি সৌমিত্রের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন খুব দ্রুতই। ১৯৫৮ সালের ৯ আগস্ট, ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের শুভ মহরত অনুষ্ঠান। এক শটেই তিনি তার প্রথম দৃশ্য ঠিকঠাক করতে পেরেছিলেন। চলচ্চিত্রে নবাগত এই সদ্য তরুণ তাঁর প্রথম ঝলকেই পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মন জিতে নিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি বুঝতে পারলেন, এই চলচ্চিত্রই তাঁর আসল ঠিকানা। তাঁর মেধার পরিপূর্ণ স্ফুরণ কেবলমাত্র এখানেই সম্ভব। 

জমিয়ে চললো ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের শুটিং। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর জান-প্রাণ উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাঁর বয়স কিছুটা কম ছিল গল্পের অপুর তুলনায়। তাই চেহারায় ভারিক্কি ভাব আনতে এবং কিছুটা বেশি বয়সী দেখাতে সত্যজিৎ রায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দাঁড়ি সহ উপস্থাপন করেন।

দাঁড়ির কারণে সৌমিত্রকে মানিয়েছিল।
চিত্র: দাঁড়িসহ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারের সময় সত্যজিৎ রায় উল্লেখ করেছিলেন,

দাঁড়িসহ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে আমার সবসময় তরুণ বয়সের রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়তো।

সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ডুয়ো।
চিত্র: সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র; চিত্রসূত্র – টাইমস অফ ইন্ডিয়া

১৯৫৯ সালের পহেলা মে ‘অপুর সংসার’ মুক্তি পায়। মুক্তির পরপরই সকলের মন জয় করে নেয় ‘অপুর সংসার’।

সৌমিত্র অভিনীত 'অপুর সংসার' এর পোস্টার।
চিত্র: ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুরের সহজ সরল কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ অনবদ্য অভিনয় সকলের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

সৌমিত্র এবং শর্মিলার জুটি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
চিত্র: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুর; চিত্রসূত্র – টাইমস অফ ইন্ডিয়া

পাশাপাশি সমালোচকেরা চলচ্চিত্রের সকল কলাকুশলীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যান। ১৯৫৯ এবং ১৯৬০ সাল, এই দুই বছর জুড়ে ‘অপুর সংসার’ বেশ কিছু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করে। পাশাপাশি স্বভাবজাত অভিনেতা হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অপু’ চরিত্রে অভিনয় সকলের মন জিতে নিয়েছিল। এক শান্ত, সৌম্য যুবক, যে কিনা জীবনের মানে খোঁজায় ব্যস্ত; তার চারপাশের জীবন, তারুণ্য, তার সন্তানকে নিয়ে তার স্বপ্ন সবকিছুকেই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর স্বভাবজাত অভিনয় এক্ষেত্রে যেমন অবদান রেখেছিল, তেমনি বিভূতিভূষণের লেখা ‘অপু’ চরিত্রের প্রাঞ্জলতারও ভূমিকা ছিল। তাই, চলচ্চিত্র সমালোচকদের একাংশ বেশ জোরেসোরেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, অভিনয়ের এরূপ প্রাঞ্জলতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীতে বজায় রাখতে পারবেন কী না। ভবিষ্যতের গর্ভে সৌমিত্রের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা জানার জন্য সবাই উৎসুক হয়ে ছিল। 

‘অপুর সংসার’ এর সাফল্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নির্বাচন করলেন। সাথে সেই শর্মিলা ঠাকুর, অপুর সংসারে যার স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অনবদ্য অভিনয়ে সবাই বিমোহিত ছিল।

‘দেবী’ চলচ্চিত্রটি তখনকার সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চলচ্চিত্রে যদিও সম্পূর্ণরুপে দেবী কালীর রুপে দয়াময়ী চরিত্রে অভিনয় করা শর্মিলা ঠাকুরের উপরে আলোকপাত করা হয়েছিল; তবুও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেশ প্রকৃতিজাত অভিনয় করেছিলেন। সমালোচকেরা তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

সৌমিত্র 'দেবী' চলচ্চিত্রে মুখ্য পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
চিত্র: ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

টানা দুইটি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনা করা চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করলেন। ততদিনে তিনি মোটামুটি আকারে পরিচিত। এবার তাঁর প্রতিভা ধরা পড়লো তপন সিনহার চোখে।

তপন সিনহা সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ভারত তখন কেবল নিজেকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে কোনো এক পরিচালকের কেবলমাত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখার জন্য যুক্তরাজ্য গমন নিতান্তই অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু তপন সিনহা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। 

তপন সিনহার হাত ধরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এক নতুন যাত্রা শুরু হয়।
চিত্র: তপন সিনহা; চিত্রসূত্র – Learning & Creativity

ব্যক্তিগতভাবে তপন সিনহা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় একজন ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে, রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী উপন্যাসগুলো ছিল তাঁর আগ্রহের মূল লক্ষ্যবস্ত। 

১৯৬০ সালের দিকে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ নিয়ে কাজ শুরু করার মনস্থির করেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে তপন সিংহের মনে ধরে। এতদিন পর্যন্ত তিনি যেসকল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তারা ছিল কিছুটা আত্মমগ্ন এবং সামাজিক প্রথার সাথে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ চলচ্চিত্র ছিল কিছুটা নিরীক্ষাধর্মী। তাই তাঁর উপস্থিতিও ছিল কিছুটা ভিন্ন ধরনের। কিন্তু ‘অমূল্য’ চরিত্রে এই পরীক্ষাও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সফলতার সাথে উতরে যান। 

সত্যজিৎ রায় এরপরে আসেন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘তিন কন্যা’ নিয়ে। তিনটি সমান্তরাল ঘটনাবলি নিয়ে সাজানো এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্র নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। তাঁর সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন অপর্ণা সেন। তাঁদের অভিনয় দর্শক এবং সমালোচক, উভয় পক্ষেরই প্রশংসা পায়। 

চিত্র: ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

আবার সৌমিত্র দল বাঁধেন তপন সিনহার সাথে। তপন সিনহা তখন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝিন্দের বন্দী’কে পর্দায় আনতে চাচ্ছিলেন। মূল চরিত্রে উত্তম কুমার অভিনয় করলেও খলনায়কের চরিত্রে সৌমিত্রের অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়। 

পরবর্তীতে বহু পরিচালকের অধীনে তিনি বহু চরিত্রে অভিনয় করেন। পুরো ৬০ এবং ৭০ এর দশক জুড়ে তিনি পূর্ণোদ্যমে চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। 

তবে ১৯৭০ সালে তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সাথে সৌমিত্রের এক তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। সরকার সৌমিত্রকে ভারতের অন্যতম বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বভাবতই, যেকোনো অভিনেতার জীবনে এটি গুরুত্বপূর্ণ এক অর্জন। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। তৎকালীন সরকার নীতিগতভাবে শিল্প-সংস্কৃতি বান্ধব ছিলনা। চলচ্চিত্র শিল্প নানাবিধ বিরূপতার সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দেওয়া এই পুরস্কারকে স্বীকার করার অর্থ হলো, সরকারের এরূপ কার্যক্রমকে সমর্থন করা।

যদিও এসকল কথা তখন জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের পদক স্বীকার না করার কারণ ব্যাখ্যা করেন। 

সৌমিত্রের জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৭৪ সালে। বলুন তো, কার হাত ধরে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে।

চিত্র: সত্যজিৎ রায় ;চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

সত্যজিৎ রায় তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষ চন্দ্র মিত্রকে (ওরফে ফেলুদা) কেবল কাগজ কলমে বন্দী না রেখে, চলচ্চিত্রের রঙিন পর্দায় সকলের সামনে উপস্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। 

ফেলুদা বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র।
চিত্র: সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ফেলুদা এবং তোপসে; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তীক্ষ্ণ ও ধারালো দৃষ্টি, সবসময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, লম্বা চওড়া, পঁচিশোর্ধ্ব এক যুবক ফেলুদা। যার মূল শক্তি হচ্ছে তার শাণিত বুদ্ধি। হঠাৎ করে তাকালে ঠিক বোঝা না গেলেও, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখে বিদ্যমান বুদ্ধির ঝলক কারো দৃষ্টি এড়াবে না। হঠাৎ করে কাউকে দেখে অনেক কিছু বলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে যা আসলে মনোযোগী চোখের পর্যবেক্ষণের ফল। এমন চরিত্রে চল্লিশে পা দিবে এমন কাউকে মানাবে কী না, তা নিয়ে সবাই কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল। তাছাড়া, কেবল ফেলুদা চরিত্রের একার উপরেই তো সব কিছু নির্ভর করছে না। সাথে আছে ফেলুদার সার্বক্ষণিক দুই সঙ্গী, তার খুড়তুতো ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্র (ওরফে তোপসে) আর লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি (ওরফে জটায়ু)। এই সম্মিলনের কোনো একজনের ব্যর্থতাও চলচ্চিত্রকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কেননা সোনার কেল্লা উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে বাকি দুই চরিত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই কেবল সৌমিত্রকে ফেলুদা হিসেবে মানাবে কী না সেই চিন্তাই নয়, বরং অন্য চরিত্রগুলো নিয়েও সত্যজিৎ রায় বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। 

শুরু হলো অভিযান। সময় নিয়ে এবং যত্ন করে তোপসে এবং জটায়ুকে খোঁজা শুরু হলো। শেষে তোপসে চরিত্রে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্তকে বাছাই করা হলো।

জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্ত অভিনয় করেন।
চিত্র: জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্ত; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

বাকিটুকু ইতিহাস। সাধারণ দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘সোনার কেল্লা’কে গ্রহণ করলো। আর ৪০ বছর বয়সী সৌমিত্রের অভিনয় দেখে কেউই বলবে না যে, তাঁর বয়স ২৫ বছরের থেকে একদিনও বেশি। চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যেন ঠিক অবিকল বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে ফেলুদা উঠে এসেছেন পর্দায়। বাকি দুই চরিত্রও তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন। 

সৌমিত্র অভিনীত 'সোনার কেল্লা' চলচ্চিত্রের পোস্টার।
চিত্র: ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

ফেলুদা চরিত্রে সেই যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন, বাঙালির মনে তিনি নিজের জায়গা স্থায়ী করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে সব্যসাচী চক্রবর্তী, আবির চট্টোপাধ্যায় সহ আরো অনেকেই চলচ্চিত্রের পর্দা বা টেলিভিশনে ফেলুদা চরিত্রে সামনে এসেছেন। কিন্তু তারা কেউই সৌমিত্রকে প্রতিস্থাপন করতে পারেননি। ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫ সাল জুড়ে সোনার কেল্লা রাজ্য এবং জাতীয় পর্যায়ে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়। 

১৯৭৯ এবং ১৯৮০; এই দুই বছর ছিল সৌমিত্রের জন্য অনেকটা স্বপ্নের মতন। নিজের জীবনের সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র এই সময়েই করা। 

প্রথমে আসবে ১৯৭৯ সালে দিলীপ দাসের পরিচালনায় ‘দেবদাস’। শরতের দর্শকপ্রিয় কিন্তু বিয়োগাত্মক রচনা ‘দেবদাস’ বাংলা ভাষার চিরায়ত একটি রচনা। তাই চলচ্চিত্রের পর্দায়ও একে নিয়ে আসার সময় অধিকতর যত্নবান হতে হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতদিনের অভিনীত সমস্ত চরিত্রের বিপরীত ছিল দেবদাস চরিত্রটি। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে এই পরীক্ষায়ও সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।

১৯৭৯ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পুনরায় আবার জোড় বাঁধলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ যেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল, আর তা হলো চলচ্চিত্রের খলনায়ক এবং ফেলুদার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘মগনলাল মেঘরাজ’, মূল উপন্যাসে যে কখনো কখনো ফেলুদাকে পর্যন্ত টক্কর দিয়েছে। এরূপ চরিত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তিনি অভিনয় করেছিলেন।

ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কোনো বিকল্প ছিল না।
চিত্র: ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

অরাজকতায় ভরা সমাজে কেউ না কেউ থাকেন, যারা স্রোতের বিপরীতে চলেন। সমাজের অধোগতি দেখে তারা ব্যথায় কুঁকড়ে যান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মত উটপাখির ন্যায় বালিতে মুখ লুকিয়ে ফেলেন না, বরং দৃঢ়চিত্তে চলমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়ে যান। যুগে যুগে এমন মানুষদের, এরূপ সমাজ সংস্কারকদের মানবজাতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় হয়তো তাঁদের নাম উঠেনি, কিন্তু মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায় তাঁরা স্থান করে নিয়েছেন। 

উদয়ন পণ্ডিত চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ছিল নিখুঁত।
চিত্র: ‘উদয়ন পণ্ডিত’ চরিত্রে সৌমিত্র; চিত্রসূত্র – Satyajit Ray organization

এমনই একটি চরিত্র নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিলেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৮০ সালের দিকে সুযোগ এসে গেলো। ১৯৬৮ সালে তাঁর পরিচালনায় নির্মিত ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ এর সিক্যুয়েল বানানোর পরিকল্পনা করলেন। এই চলচ্চিত্রের ‘উদয়ন পণ্ডিত’ চরিত্রটিই ছিল পূর্বে বর্ণিত সেই সমাজ সংস্কারকের। এই চরিত্রের জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পছন্দ করলেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৮০ সালের ১৯ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটির এই কাজ সমালোচকদের বাহবা কুড়িয়ে নিলো।  

ততদিনে মোটামুটি বাঙালির জনমানসে তিনি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। হয়তো ঠিক উত্তম কুমারের মত রোমান্টিক হিরো হিসেবে নয়, কিন্তু নিজের মত করে একটা জায়গা তিনি তৈরি করে ফেলেছিলেন। তাই জননন্দিত সত্যজিৎ রায়, দিলীপ রায় কিংবা তপন সিনহার মত পরিচালকদের থেকে কিছুটা মনোযোগ সরিয়ে সমকালীন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অঞ্জন দাস, অপর্ণা সেন এবং গৌতম ঘোষের মত পরিচালকদের সাথে কাজ করা শুরু করেন। সেই হিসেবে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণ না করলেও তাঁদের পরিচালনায় করা চলচ্চিত্রগুলো বরাবরই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। 

ঠিক এমনই একটি চলচ্চিত্র ছিল সরোজ দে’র পরিচালনায় ‘কোনি’।

কোনি' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র” ‘কোনি’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্রের ভূমিকা ছিল একজন সাঁতার প্রশিক্ষকের। কলকাতার এক অখ্যাত বস্তির বালিকার মাঝে সাঁতারের জন্য তীব্র ইচ্ছা দেখে প্রশিক্ষক তাঁকে তুলে নিয়ে আসেন। জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তাকে সফল করার জন্য প্রশিক্ষকের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অদম্য চেষ্টা সকলের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একে নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২০১২ সালের দিকে এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছিলেন, 

নিজের কঠিন সময়ে নিজে নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে আমি ‘ফাইট কোনি ফাইট’ শব্দবন্ধটি বিড়বিড় করতাম। তৎকালীন বাঙালি সমাজে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। 

১৯৮৬ সালে পরিচালক বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে বলিউডে অভিষেক হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেনা পাওনা’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বানানো ‘নিরুপমা’ নামের এই চলচ্চিত্রে সৌমিত্রের সহ অভিনেত্রী হিসেবে ছিলেন রূপা গাঙ্গুলি। যদিও এই চলচ্চিত্রটি তেমন সাফল্যের মুখ দেখেনি। 

কিছুদিনের বিরতি নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আবার জোট বাঁধেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। তবে এবারের চলচ্চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। সমাজের এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের অপরাধ চক্রকে চিত্রায়িত করাই ছিল এই চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য। 

সমাজের সাধারণ মানুষ অধিকাংশই ধর্মভীরু। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির আড়ালে নিজেদের অবৈধ অর্থনৈতিক এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে ঠিকই নিজেদের আখের গুটিয়ে নেয় তারা। ধর্মীয় কার্যক্রমের ছত্রছায়ায় রাজনীতিবিদ এবং অসৎ সরকারী কর্মকর্তারাও এরূপ প্রভাবশালীদের সহায়তা করে। এরূপ প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রটি যাতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

গণশত্রু' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

সমালোচকেরা সত্যজিতের পরিচালনা এবং সৌমিত্রের অভিনয়, দুইয়েরই ভূয়সী প্রশংসা করে। 

বাঙালির মনে ফেলুদার জায়গা পাকাপোক্তভাবে দখল করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাই, সত্যজিৎ রায়ের জীবদ্দশায় যখন ফেলুদাকে অন্যান্য পরিচালকেরা ছোট পর্দায় আনতে চাচ্ছিলেন, তাদেরও প্রথম পছন্দ ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন সংস্থা দূরদর্শন বাংলাতে ফেলুদার ‘ঘুরঘুঁটিয়ার ঘটনা’ এবং ‘গোলকধাঁম রহস্য’তে অভিনয়ের জন্য সৌমিত্র ছিলেন বিভাস চক্রবর্তীর ভরসা। 

বিভাস চক্রবর্তী
চিত্র: বিভাস চক্রবর্তী; চিত্রসূত্র – Daily Star

১৯৯০ সালে তিনি এবং সত্যজিৎ রায় আবার একত্র হন ‘শাখা প্রশাখা’ চলচ্চিত্রের জন্য। এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের গল্প এটি। একই সুতায় টানা চার প্রজন্মের গল্প বলেছেন তিনি। যদিও মূল আলোকপাত ছিল তৃতীয় প্রজন্মের উপরে। তৃতীয় প্রজন্মের প্রশান্ত মজুমদারের চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র।

সৌমিত্র - সত্যজিৎ জুটির সর্বশেষ চলচ্চিত্র
চিত্র: ‘শাখা প্রশাখা’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – আইএমডিবি

দুঃখজনকভাবে এই চলচ্চিত্রই ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রের বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিচালক – অভিনেতা জুটি সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ কাজ। ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর আগে তাঁরা দুইজনে আর কোনো চলচ্চিত্রে একসাথে কাজ করেননি।

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সাথে সাথেই সমাপ্তি ঘটে বাংলা সাহিত্যের একটি যুগের।

চিত্র: সত্যজিৎ রায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি; চিত্রসূত্র – Dailyo.in

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ‘উত্তরণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র তাঁর ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। 

গোটা ‘৯০ এর দশক জুড়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে বেশ পরিপক্বতা লক্ষ্য করা গেছে। বয়স এবং অভিজ্ঞতার মিশেল তাঁর মাঝে যেন এক আলোকছটার জন্ম দিয়েছিল। এরই প্রতিফলন ঘটেছে পুরো দশক জুড়ে সৌমিত্রের অভিনয়ের মধ্যে। ১৯৯৫ সালে পিনাকী চৌধুরির পরিচালনায় ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন?’, ১৯৯৬ সালে প্রভাত রায়ের পরিচালনায় ‘লাথি’ বা ১৯৯৯ সালে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’ চলচ্চিত্রে তাঁর পরিপক্বতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। 

১৯৯৯ সাল ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের একটি বিশেষ বছর। সেই বছরে ফ্রান্স সরকার এই মহান প্রতিভাকে সম্মান জানানোর জন্য সেদেশের সাহিত্যকলার সর্বোচ্চ পুরস্কার Commandeur de l’ Ordre des Arts et des Lettres দ্বারা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মানিত করে। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্স সরকার প্রবর্তিত এই পুরস্কার সারা বিশ্বের শিল্প সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পুরস্কার। 

ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বরাবরই বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কের শীর্ষে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, সিলেকশন বোর্ডের স্বজনপ্রীতি এবং হিন্দিভাষী চলচ্চিত্রকে তুলনামূলক অধিকতর সুবিধা প্রদান করা। সময়ে সময়ে অনেকে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বোধহয় এক্ষেত্রে সবার থেকে ব্যতিক্রমী ছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর অভিনীত ‘দেখা’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আয়োজনের স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েও পুরো ব্যবস্থার প্রতি প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। 

২০০৪ সালে ভারত সরকার ভারতের এই গুণী সন্তানকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ দ্বারা সম্মানিত করে।

এর কিছুদিন পরে, ২০০৬ সালে তাঁর ‘পদক্ষেপ’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে তিনি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

সৌমিত্র অভিনীত 'পদক্ষেপ' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: সৌমিত্র অভিনীত ‘পদক্ষেপ’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

২০০৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে নিজের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। 

যথাযথ বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে বিভিন্ন পুরস্কার এবং অ্যাওয়ার্ডগুলো আমার কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে এই অ্যাওয়ার্ডগুলো দিয়ে আসলে তেমন কিছু যায় আসে না। … প্রকৃতপক্ষে এটি এক ধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার। যদি দুই বা তিন বছর আগে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হতাম, তবে আমি হয়তো তা প্রত্যাখ্যান করতাম। আমি এখন বৃদ্ধ এবং সকল বিষয়কে তাই এখন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করি।….. যদিও এটি আমার বেশ ভালো কাজ করা একটি ছবি, কিন্তু সবচেয়ে ভালো না।…… আমি সত্যজিৎ রায়ের সাথে মোট ১৪টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। এদের মধ্যে বেশ কিছু, যেমন দেবী এবং চারুলতা ছিল চিরায়ত কালোত্তীর্ণ।…… যদিও চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পুরস্কারগুলোর প্রতি আমি আমার আস্থা নেই।  

২০১০ এর পরে এসে তিনি চলচ্চিত্রের থেকে একটু দূরে আসেন। এর পিছনে বার্ধক্যই মূল কারণ ছিল। যদিও ২০১৫ সালে ‘বেলাশেষে’, ২০১৬ সালে ‘প্রাক্তন’ বা ২০১৭ সালে ‘পোস্ত’ এর মত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাসঙ্গিক ছিলেন। 

 সৌমিত্র অভিনীত 'বেলাশেষে' চলচ্চিত্রের পোস্টার
চিত্র: সৌমিত্র অভিনীত ‘বেলাশেষে’ চলচ্চিত্রের পোস্টার; চিত্রসূত্র – ইউটিউব

Legion d’Honneur হলো ফ্রান্স সরকারের সামরিক এবং বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মাননা।

১৯৮৭ সালে সত্যজিৎ রায়কে এই সম্মাননা প্রদান করে ফ্রান্সের সরকার। এর ঠিক ৩০ বছর পরে, ২০১৭ সালে, সত্যজিৎ রায়ের সাথী এবং সুযোগ্য শিষ্য সৌমিত্র এই সম্মাননা লাভ করেন।

ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রদূত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মাননা প্রদান করছেন।
চিত্র: ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রদূত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মাননা প্রদান করছেন; চিত্রসূত্র – The Hindu

ভারতে নিযুক্ত ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসেডর অ্যালেক্সান্ডার জিগলার ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে এই সম্মানন তুলে দেওয়ার সময় উল্লেখ করেন,

১৯৮৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি এমনই এক সন্ধ্যায়, ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকোয়া মিটারেন্ডের কলকাতা সফরের সময় তিনি কিংবদন্তিতুল্য বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের হাতে এই পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। একজন গুরু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি নিজেকে একজন কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তাঁর হাতে একই পুরস্কার আমি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তুলে দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবো।

সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়ও উপস্থিত ছিলেন। 

সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়;
চিত্র: সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়; চিত্রসূত্র – টাইমস অফ ইন্ডিয়া

আমি আজ ঠিক ১৯৮৯ এর ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যার মতই আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পুরস্কার নিতে দেখা সত্যিই একটি আনন্দের অনুভূতি। মনে হচ্ছে যেন, ৩০ বছর পরে কোনো একটি চক্র পূর্ণ হতে যাচ্ছে। 

২০২০ সালের কোভিড ১৯ এর প্রাদুর্ভাবের মাঝে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত হন। ৫ অক্টোবর এই টেস্টের ফলাফল আসে। পরবর্তী দিন, অর্থাৎ ৬ অক্টোবর তাঁকে কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ২৫ অক্টোবর তিনি করোনা নেগেটিভ হিসেবে চিহ্নিত হলেও পরবর্তীতে নানা রকম জটিলতার কারণে আবারও তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। 

মাত্র ২৪ বছর বয়সে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় শুরু। দিন গড়িয়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে; সময়ের সাথে সাথে তিনি পরিণত হয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে। তাঁর প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে আমরা কেবলই বলতে পারি, 

'বেলাশেষে' যাচ্ছ ফিরে জানি
দেখা হবে 'শেষ প্রহরের' পরে
'পুনশ্চ' বলবো তোমায় ফের
আবার কোনো 'অপুর সংসারে'!!

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

তথ্যসূত্র

গ্রন্থসূত্র:

  • রায়, সত্যজিৎ (২০০৭)। সত্যজিৎ রায়: ইন্টারভিউজ। মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী। ISBN – 978-1-57806-937-8

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s